আমার সবচেয়ে আদরের হচ্ছে বড় ভাইয়ের তিন ছেলেমেয়ে।বাড়ি গেলে ওদের সঙ্গেই দিন-রাত কাটতো আমার। আমার হাতেই হতো ওদের খাওয়া-গোসল সবকিছু। ঈদের আগে বাড়ি যাওয়ার সময় হলেই প্রতিদিন অসংখ্যবার ফোন পেতাম, কার জন্য কী কী নিতে হবে।আমার কষ্ট হলেও ওদের জন্য সেসব আমি নিয়ে যেতাম।কিন্তু এবার আর ওদের কোনও আবদার নেই। গত ঈদে শেষবারের মতো দেখে এসেছি―আমার মাকে আর এই তিনজনকে কখনও দেখবো না―এটাই ভাবতে পারি না। আমি যদি কেবল এই চারটা মানুষকেও দেখতে পেতাম তাহলে আর দুঃখ থাকতো না!আমার কিনে দেওয়া শাড়িতে মাকে কেমন লাগে সেটাও দেখতে পারবো না―দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাগুলো বলছিলেন পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের আঘাতে দুই চোখ হারানো সিদ্দিকুর রহমান।

আজ  ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের ছয়তলায় নির্ধারিত কেবিনে গিয়ে সিদ্দিকুরের সঙ্গে আলাপকালে  এসব কথা বলেন সিদ্দিকুর রহমান। সিদ্দিকুর বলেন,ঈদুল আজহায় গ্রামের অনেকে মিলে কোরবানি দিতাম, সকাল থেকে শুরু হতো পশু জবাই এর কাজ, আমি গোস্ত বিতরণের কাজ ভালো করতাম বলে এ দায়িত্ব আমার হাতেই থাকতো। কিন্তু, এসব কাজ আর কখনও করতে পারবো না―বলে চুপ হয়ে যান সিদ্দিকুর। চোখে থাকা কালো চশমাটা খুলে হাত দিয়ে চোখ মোছেন।আর সিদ্দিকুরের চোখের পানি দেখে মা সুলেমা খাতুনেরও এতোদিনের বাঁধ যেন ভেঙে যায়।

সুলেমা খাতুন বলেন, একা একা কাঁদি, ছেলেটা যেন টের না পায়। আমি ওকে সাহস দিয়ে রাখি। কিন্তু সেই ছেলে যখন আমার সামনে চোখের পানি ফেলে তখন মা হয়ে সেটা আমি সহ্য করতে পারি না। আমার চোখ আছে, সেই চোখে দুনিয়া দেখছি, কিন্তু পেটের ছেলের চোখ নাই, সে কিছু দেখতে পায় না―এ যে কেমন কষ্ট সেটা কেবল একজন মা বুঝতে পারবে।

সুলেমা খাতুন বলেন, ‘আমিতো ভাবি নাই আমার পোলার চোখ ভালো হবে না, আমি তো ভাবছি, ইন্ডিয়া থেকে পোলা আমার ভালো হয়ে আসবে,আমার ছেলে যে চিরদিনের মতো চোখ হারাবে সেটা ভুলেও আমার মনে আসে নাই।’

তিনি বলেন,এতো কষ্ট করে ছেলেটাকে বড় করছি,সেই ছেলে আমার চোখে দেখে না―এর চেয়ে যদি আমার চোখ নিয়েও ছেলে চোখে দেখতো তাহলেও আমার কষ্ট থাকতো না। কিন্তু ছেলের সামনে চোখের পানি ফেলতে পারি না, তাই যখন ও ঘুমিয়ে থাকে তখন কাঁদি, মনটাকে হালকা করি।

কথা বলতে বলতে সুলেমা খাতুনের এতোদিনের জমিয়ে রাখা কষ্ট যেন খেই হারিয়ে ফেলে। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, কোনোদিন বাড়ি ছাড়া থাকিনি। অথচ ছেলের সঙ্গে হাসপাতালের এই বদ্ধ ঘরে দিনের পর দিন রয়েছি, আরও যদি কষ্ট করতে হয় তাও করতাম, সবকিছুর বিনিময়েও যদি ছেলের চোখের আলো ফিরতো।

সুলেমা খাতুন  বলেন, বড় ছেলে নায়েব আলী তার তিন ছেলেমেয়ের জন্য ঈদে নতুন পোশাক কিনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চাচাভক্ত সেই তিন শিশু বাবাকে বলেছে, তোমার পছন্দ ভালো না, চাচ্চু সবসময়ে ড্রেস কিনে দেয়, চাচু সুস্থ হলে সেই ড্রেস কিনে দেবে। কিন্তু ওদেরকে কীভাবে বোঝাই, ওদের চাচ্চু আর কখনও নিজ চোখে দেখে তাদের জন্য নতুন পোশাক কিনতে পারবে না, চাচুর চোখের আলো নিভে গেছে।

মা যখন কাঁদছে, তখন সিদ্দিকুর মাথা নিচু করে বসে আছে কেবিনের বিছানায়। মা ছেলে দুজনই অনেকসময় চুপ করে থাকেন, ধাতস্ত হতে সময় নেন। পরে সিদ্দিকুর বলেন, গত সপ্তাহে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম তাকে ফোন করেছিলেন, তার চাকরির বিষয়ে কথা বলতে। রাজধানীর তেজগাঁয়ে অবস্থিত অ্যাসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডে সিদ্দিকুরের চাকরির একটা ব্যবস্থা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসানুল কবীরের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। পরদিনই সিদ্দিকুর এহসানুল কবীরের সঙ্গে দেখা করেন এবং জানতে পারেন সেখানে তার জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করেছেন মন্ত্রী। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের উপস্থিতিতেই সিদ্দিকুরের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হবে বলেও তাকে জানানো হয়েছে।তবে চাকরির পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যেতে চান জানিয়ে সিদ্দিকুর বলেন, অ্যাসেনসিয়াল ড্রাগস থেকে তাকে টাঙ্গাইলের মধুপুরে পোস্টিং নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, কিন্ত ‍লেখাপড়ার জন্য তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছেন। তিনি বলেন, আমি তিতুমীর কলেজ থেকে অর্নাস শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাই, সেখানে ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়া করার সুযোগ রয়েছে।

তবে এতোকিছুর পরও সিদ্দিকুরের কৃতজ্ঞতা জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা, হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা জাহিদুল আহসান মেনন এবং অধ্যাপক ইফতেখার মোহাম্মদ মুনিরসহ সব চিকিৎসকদের প্রতি। সিদ্দিুকর বলেন, এই স্যাররা না থাকলে আমার অনেক কষ্ট হতো, তাদের এতো আন্তরিকতা এবং ভালোবাসা আমি পেয়েছি যে, তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম। আমার এখন আর কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন নেই, কিন্তু কেবলমাত্র মানবিকতা দেখিয়ে আমাকে হাসপাতালে রেখেছেন তারা। ওনাদের ইচ্ছে, হাসপাতালে থাকতে থাকতেই যেন আমার জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা হয়। তবে ছেলের চাকরির পাশাপাশি তার একটা স্থায়ী পুনর্ববাসনের জন্যও আবেদন করেন মা সুলেমা খাতুন। তিনি বলেন, এই ছেলেকে নিয়ে তো আমি বাড়ি যেতে পারবো না। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আমি কোথায় যাবো ছেলেকে নিয়ে, ছেলের সাথে তো থাকতে হবে, বাড়িঘর সব বির্সজন দিয়ে হাসপাতালে আছি―এই ছেলেরে রেখে আমি যেতে পারবো না।

উল্লেখ্য, পরীক্ষার রুটিন ও তারিখ ঘোষণাসহ কয়েকটি দাবিতে গত ২০ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নতুন সাতটি সরকারি কলেজের সতীর্থ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালনের সময় পুলিশের ছোড়া টিয়ারশেল সরাসরি আঘাত করে সিদ্দিকুরের চোখে।এরপর সরকারিভাবে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা দিয়ে ও বিদেশে পাঠিয়েও তার চোখ আর ভালো করা সম্ভব হয়নি।তার দুই চোখই নষ্ট হয়ে গেছে।

স/মা

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন

Power by

Download Free AZ | Free Wordpress Themes