বতর্মান সময়ে হৃদরোগের প্রধান এবং মুখ্য কারণ হলো রক্তনালিতে কোলেস্টেরলের ব্লক বা প্রতিবন্ধকতা যা অন্য সব অঙ্গের রক্তনালির চেয়ে হৃৎপিণ্ডের রক্তনালিতে বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। এটা লক্ষণীয় যে, বেশি করে পোলাও-গোশত খাওয়ার পরে অনেকেরই হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।

এ ধরনের হার্ট অ্যাটাক হওয়া রোগীরা প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকেন, এটা আমরা লক্ষ করেছি। তবে কি বেশি করে তেল-চর্বিজাতীয় খাদ্য গ্রহণের ফলে হৃদরোগীরা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে থাকেন? ব্যাপারটা খুব সোজাসাপ্টা নয়। বৈজ্ঞানিকভাবে এ রকম কিছু পাওয়া যায় না যে, আপনি বেশি করে চর্বিজাতীয় খাবার গ্রহণের ফলে খাদ্যে চর্বির প্রভাবে আপনার তাত্ক্ষণিকভাবে হার্ট অ্যাটাক ঘটবে এবং আপনি আজকে চর্বি খেলে এটা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা তাত্ক্ষণিকভাবে বৃদ্ধি করবে।

এ ধরনের উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল অনেকদিন যাবৎ বিদ্যমান থাকলে ধীরে ধীরে আপনার রক্তনালিতে কোলেস্টেরল জমতে জমতে এক পর্যায়ে আপনার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এতে বছরকে বছর সময় লাগে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন তাত্ক্ষণিকভাবে খাওয়ার ফলশ্রুতিতে হার্ট অ্যাটাক কেন হচ্ছে? আমি একজন এমন রোগীর কথা বলছি ভদ্রলোকের বাড়ি রাজশাহীতে। বর্তমানে তিনি গাজীপুরে সেটেল এবং গাজীপুরেই ব্যবসা করেন, বয়স পঞ্চাশের মতো হবে। গত জ্যৈষ্ঠ মাসে সে মুড়ি দিয়ে দুইটি কাঁঠাল খেয়ে ফেলেছিল, তার ফলশ্রুতিতে তিনি হার্ট অ্যাটাক নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ভদ্রলোক মেদভুঁড়ি সম্পন্ন মোটসোটা আকৃতির। এবার দুটি ঘটনাকে মূল্যায়ন করা যাক।

রাজশাহীতে কাঁঠাল কেমন পাওয়া যায় জানি না, আমার মনে হয় রাজশাহীতে সুস্বাদু কাঁঠাল তেমন একটা না পাওয়া যাওয়ায় তিনি গাজীপুরে এসে কাঁঠাল খেয়ে খুবই মজা পেয়েছেন এবং অন্যরাও যারা পোলাও-মাংস খেয়ে বেশ মজা পান তারাও পোলাও-মাংস খেয়ে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছেন, এর একটা মিল পাওয়া গেল। উভয়ক্ষেত্রেই একটা ব্যাপার মিলে যায় যে, তারা খাবার খেয়ে বেশি মজা পাওয়ার জন্য বেশি করেই খেয়েছেন। খুব বেশি পেট ভরে খাওয়ার ফলে হজমের জন্য অনেক বেশি রক্ত পাকস্থলিতে বা পেটে সরবরাহের ফলে শরীরের অন্য অঙ্গে রক্ত সরবরাহ কমে যায় এবং বেশি পরিমাণে পেট ভরে খাওয়ার ফলে ফুসফুসের মাধ্যমে বাতাস গ্রহণ করার ক্ষমতা কমে যায়, বিশেষ করে মেদভুঁড়িসম্পন্ন মোটাসোটা লোকেদের বেলায়, এর ফলে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণও কমে যায়। রক্তে অক্সিজেনের কম মাত্রা ও কম পরিমাণ রক্ত সরবরাহের ফলে হৃদরোগীদের হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ ও অক্সিজেন সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় তাত্ক্ষণিকভাবে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে থাকে। সুতরাং হৃদরোগীরা কোরবানির সময় অতিভোজন অবশ্যই এড়িয়ে চলবেন। সামনে কোরবানির ঈদ, আপনারা কোরবানির গোশত খাবেন কিনা এটা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়।

কোরবানির গোশত খাবেন এতে কোনো প্রশ্ন নেই, তবে যারা হৃদরোগে আক্রান্ত তারা কম চর্বিযুক্ত গোশত চার-পাঁচ বেলা খেতে পারবেন। তবে আপনাকে এটাও মানতে হবে, বছরের অন্য সময় অবশ্যই গরু, খাসির গোশত খাবেন না। কেউ কেউ ভুঁড়ি খেতে পছন্দ করে কিন্তু চর্বির ভয়ে খেতে পারছেন না, আপনি মনে চাইলেই একবেলা ভুঁড়ি এবং একবেলা সিনার মাংস ও কলিজা খেতে পারবেন, তবে শর্ত একটাই বছরের বাকি সময় আর এগুলো খাবেন না। কোরবানির পশু নির্বাচন থেকে শুরু করে গোশত কাটা, রান্না ও খাওয়া সব পর্যায়েই একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন যাতে গোশতে চর্বির পরিমাণ খুবই কম অথবা একেবারে চর্বিমুক্ত করা যায়। তাই হৃদরোগীদের এ সময় আরও যত্নবান হতে হবে।

ডা. এম শমশের আলী, সিনিয়র কনসালটেন্ট (প্রা.), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শমশের হার্ট কেয়ার এবং মুন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বাবর রোড, শ্যামলী।

স/মা

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন