নিজস্ব প্রতিবেদক :

২০শে শ্রাবণের সকালটা আর দশটা ভোরের মতো সোনারঙা প্রভাত ছিল না। আগের দুইদিনের মুষলধারার বৃষ্টিপাতের রেশ তখনো কাটেনি। মেঘ থমথমে আকাশ মাথায় নিয়েই আমাদের বের হতে হলো। কবিগুরুর বাড়িতে সাহিত্য অনুষ্ঠান। গুরুপ্রণাম বলে কথা! ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া। দূরও কম নয়। মিরপুর থেকে সভাপতি সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ, অধ্যাপক শাহানা পারভীন, কবি ও ছড়াকার আতিক হেলাল, কবি আর্কিটেক্ট মীর ইশরাত জাহান, শান্তিবাগ থেকে এলেন অগ্রজ আবৃত্তিকার বদরুল আহসান খান, কবি কবি ফাতেমা খাতুন রুনা, মোহাম্মদপুর থেকে সদ্যসাবেক জজ কবি মিঞ্রা মুহম্মদ আলী আকবর আজিজী, ডিওএইচএস থেকে কবি লে. কর্ণেল কবি এম এম ইকবাল আলম (অব.), ফার্মগেট থেকে কারিতাস-এর পরিচালক কবি থিওফিল নকরেক, যাত্রাবাড়ি থেকে কবি জাফর পাঠান, কবি রবিউল প্রধান, ধানমন্ডি থেকে কবি ও ছড়াকার মোহাম্মদ হোসেন আদর, উত্তরা থেকে কবি মোরাই রাশেদ, আসাদ গেট থেকে কবি ও কথাসাহিত্যিক পারভেজ বাবুল, ইস্কাটন থেকে কবি, কথাসাহিত্যিক ও অভিনেতা মির্জা আনোয়ার পারভেজ, রামপুরা থেকে কবি সম্রাট শাহ এসে হাজির হলেন ফার্মগেট তেজগাঁ কলেজের সামনে। সকাল ছটায় সাভার থেকে ভ্রমণসঙ্গী হলেন কবি ও সম্পাদক হাফিজ রহমান, ভাবী মিসেস হাফিজ রহমান, কবি ফাহমিদা জিগর জাহান, কবি ও ছড়াকার জোয়ারদার আবদুস সামাদ। পাংশা থেকে যোগ দিলেন প্রিন্সিপাল জনাব কবি কায়কোবাদ, চুয়াডাঙ্গা থেকে কথাসাহিত্যিক পিন্টু রহমান। অসুস্থতার জন্য যেতে পারলেন না কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট সাহিত্য ও ক্রীড়া সংগঠক মতিউর রহমান লাল্টু (যার আগ্রহে ও আমন্ত্রণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের আগের দিন তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হন।, লেখক পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক কবি ও সম্পাদক মাহফুজার রহমান মণ্ডল, পরিষদের পটুয়াখালি শাখার সভাপতি কবি ও কথাসাহিত্যিক আনোয়ার হোসেন বাদলসহ আরো কয়েকজন। ভোরের হাওয়ায় গা ভাসিয়ে গরম চায়ের কাপে ঠোঁট ভিজিয়ে বৃষ্টির শঙ্কা মাথায় নিয়ে শুরু হলো আনন্দযাত্রা। রসালো সব গল্প, হাসি আর গানে সারা পথ মাতিয়ে রাখলেন সবাই। গান গাইলেন অগ্রজ আবৃত্তিকার বদরুল আহসান খান, কবি মিঞ্রা মুহম্মদ আলী আকবর আজিজী, কবি থিওফিল নকরেক, শাহানা পারভীন, কবি জাফর পাঠান, ছড়াকার আতিক হেলাল, ফাহমিদা জিগর জাহান, মীর জাহান, মির্জা আনোয়ার পারভেজ, রবিউল প্রধান, ফাতেমা খাতুন রুনা, সম্রাট শাহসহ আরো অনেকে। বাংলাদেশ লেখক পরিষদে যে এত শিল্পী রয়েছেন আগে কারো জানা ছিল না। প্রচন্ড গরম থাকলেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির কারণে ভ্যাবসা গরম থেকে রক্ষা। পাটুরিয়া ঘাটে একটা মিনি ফটোসেশন হয়ে গেল। এরপর ফেরির ওপরে ব্রেড, ডিম, কলা, আপেল সহযোগে সকালের নাস্তাপর্ব সারতে সারতে ফেরি দৌলতদিয়া ঘাটে এসে পৌঁছে গেল। গাড়ি ফেরি থেকে নেমে রাজবাড়ি হয়ে কুমারখালির পথে চললো। বাংলাদেশ লেখক পরিষদের গাড়িবহর কুমারখালী পৌঁছতেই কুমারখালীর এক দল সাংবাদিক পরিষদের সদস্যদেরকে স্বাগত জানান। প্রেসক্লাবের বর্তমান সভাপতি কবি বাবলু জোয়ার্দার, সাবেক সভাপতি ও দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিনিধি দিপু মালিক, দৈনিক সংবাদের প্রতিনিধি রওশন জোয়ার্দার, সুজয় চাকীসহ আরো অনেকে প্রমুখ। কুষ্টিয়া থেকে হুমায়ুন কবির: বাংলাদেশ লেখক পরিষদের উদ্যোগে বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর এবং বাংলা লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক বাউল সঙ্গীতের অন্যতম পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার-এর (জন্ম: ১৮৩৩-মৃত্যু: ১৬ এপ্রিল, ১৮৯৬) তিনি সর্বসমক্ষে ফকির চাঁদ বাউল নামেও পরিচিত ছিলেন। বাড়ি ও উপমহাদেশের প্রথম ঐতিহাসিক প্রেসটি ছাড়াও কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের নামে সদ্য প্রতিষ্ঠিত দর্শণীয় মিউজিয়াম দেখলেন বিশিষ্ট কবি-লেখকদের সংগঠন বাংলাদেশ লেখক পরিষদের সদস্যরা কুমারখালীর কুণ্ডুপাড়ায় অবস্থিত আদর্শবাদী, পরিশ্রমী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথের সেই ঐতিহাসিক এমএন প্রেসের ধ্বংসাবশেষ ঘুরে ঘুরে দেখলেন তাঁরা। লেখক পরিষদের সদস্যদের সাথে কুমারখালীর সাংবাদিকরা ছাড়াও কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের উত্তরসূরি গীতারাণী মজুমদারও অনেকটা সময় সঙ্গ দেন। পরিষদ প্রেসক্লাবের বর্তমান সভাপতি কবি বাবলু জোয়ার্দার, দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিনিধি দিপু মালিক, দৈনিক সংবাদের প্রতিনিধি রওশন জোয়ার্দার, সুজয় চাকীসহ গীতারাণী মজুমদারকে এই সঙ্গ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানায়। এরপর লেখক পরিষেদের সদস্যরা সময় স্বল্পতার কারণে রাস্তা থেকেই ঊনবিংশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা গদ্যের ঊন্মেষকালের ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক মীর মশাররফ হোসেনের ( জন্ম ১৩ নভেম্বর ১৮৪৭–মৃত্যু ১৯ ডিসেম্বর ১৯১২) বাস্তভিটা (কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের লাহিনীপাড়া গ্রামে) দেখে লেখক পরিষদের গাড়িবহর কুষ্টিয়া টেগর লজের (কুষ্টিয়া কুঠিবাড়ি) পথে রওনা হয়। পরিষেদের সদস্যরা কুষ্টিয়া পৌঁছলে সেখানে তাদেরকে স্বাগত জানান জ্যোতি ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চিফ এক্সজিকিউটিভ ও বিশিষ্ট কবি সৈয়দা হাবিবা। দুপুর ৩.০০টায় শুরু হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৬তম মৃত্যুদিবস ২২শে শ্রাবণ উপলক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠান। চিকগগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধক বিশিষ্ট সাহিত্য ও ক্রীড়া সংগঠক মতিউর রহমান লাল্টু যেতে পারেননি। পরিষদের সভাপতি সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ এর সভাপতিত্বে ও কবি আতিক হেলালের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র ও টেগর লজ-এর পুর্নগঠনের উদ্যোক্তা জনাব মো: আনোয়ার আলী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অগ্রজ আবৃত্তিকার বদরুল আহসান খান, কবি লে. কর্ণেল কবি এম এম ইকবাল আলম (অব.), কারিতাস-এর পরিচালক কবি থিওফিল নকরেক। অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সদ্যসাবেক জেলা জজ কবি মিঞ্রা মুহম্মদ আলী আকবর আজিজী। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক পিন্টু রহমান ও কবি ও সম্পাদক হাফিজ রহমান। টেগোর লজে ছোট্ট অনুষ্ঠান শেষে জ্যোতি ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশনে আয়োজিত লাঞ্চে যোগ দেন পরিষদের সদস্যরা। সেখানে সৈয়দা হাবিবার আপায়নে মুগ্ধ হন সবাই। দেবাশীষের রান্না করা বিশেষ করে খাবারের মেন্যুতে চিকন চালের সাদা ভাতের সাথে সুস্বাদু ভেজিটেবল, পদ্মার টাটকা বড় ইলিশ, খাসির মাংশ, মজাদার ডালের ভূয়শী প্রশংসা করেন সবাই। এরপর জিকে কলোনিতে অবস্থিত জ্যোতি ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশনে অনুষ্ঠিত হয় কবিতা-গানের এক মনোরম আসর। প্রায় দুই ঘন্টার এ অনুষ্ঠান প্রাণ ভরে উপভোগ করেন সবাই। গানে-কবিতায় পুরো অনুষ্ঠান মাতিয়ে রাখেন পরিষদের সদস্যরা। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা মতিউর রহমান লাল্টু এবং সৈয়দা হাবিবাকে অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে পরিষদের গাড়িবহর লালন শাহের মাজার পরিদর্শন করে ঢাকার পথে রওনা দেয়। ফেরার পথে আবার গান। সারা রাস্তা গল্প-গানে মাতিয়ে রাখলেন পরিষদের কবি-শিল্পীরা। ঢাকায় পৌঁছতে রাত ২.০০টা বেজে গেল। তারপরও কারো চোখে-মুখে ক্লান্তি বা বিরক্তির ছাপ দেখা গেল না। এখন সবাই অপেক্ষা করছেন পরের প্রোগ্রামের জন্য।

স/এষ্

print

Facebook Comments

এই নিউজ পোর্টালের কোনো লেখা কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

আরও পড়ুন