মুন্সীগঞ্জে মেঘনায় মাছ ধরা থেকে বাধা দিতে পারছে না প্রশাসন

মুন্সীগঞ্জে মেঘনা নদীতে জেলেদের মাছ ধরা থেকে বাধা দিতে পারছে না প্রশাসন

এম এম রহমান, মুন্সীগঞ্জ: মেঘনা নদীতে নিষেধাজ্ঞার ৩য় প্রথম দিন থেকেই দিনে রাতে অবাধে মা ইলিশ নিধন যাচ্ছে স্থানীয় জেলেরা। মেঘনা নদীতে ৩য় দিনেও ছিলো জেলেদের কর্মব্যস্ততা। জেলেদের কোনভাবেই ধাবিয়ে রাখতে পারছেনা প্রশাসন।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলেদেরকে নদীতে অপ্রতিরোধ্য গতিতে মাছ শিকার করতে দেখা গেছে। শুক্রবার দিনভর তাদের কর্মযজ্ঞ দেখে মনে হলো অভিযানের সমঢটা পার হয়ে গেছে। সরকারী নিষেধাজ্ঞাকে কোনভাবেই তোয়াক্কা করছে না জেলেরা। গ্রামগুলোতে পিছিয়ে নেই নারীরাও । স্বামী জেলে আর স্ত্রী হন সোর্স হিসেবে কাজ করে।

www.linkhaat.com

হাতে মোবাইল নিয়ে নদীর তীর এবং গ্রামের আনাচে কানাচে দাঁড়িয়ে থাকে নারীরা। নদী বা স্থল পথে প্রশাসনের উপস্থিতে টের পেলে ফোনের মাধ্যমে নারীরা মুহুর্তের মধ্যে নদীতে থাকা অন্যান্য জেলেদের নিকট সংবাদ পৌছে দিচ্ছে। জেলেরা নদীর তীরে অবস্থান করে মাছ শিকার এবং তীরে এসে বিক্রি করে দিচ্ছে। এক ধরনের মৌসুমী মাছ বিক্রেতারা নদীর তীরে এবং বসতবাড়ীতে রেখে ইলিশ বিক্রি করছে।

মেঘনা নদী তীরবর্তী গ্রাম চরঝাপটা, বকচর, চরআব্দুল্লাহ, কালিরচর এলাকায় প্রকাশ্যে মা ইলিশ নিধন, পরিবহন, বিক্রয় এবং মজুদ চলমান থাকলেও যেন এসব দেখার কেউ নেই। স্থানীয়রা জানান , নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিন থেকেই জেলেরা নদীতে মাছ নিধন করেই চলছে।

৩য় দিনেও মেঘনার বুকে শত শত মাছ ধরার ট্রলারকে মাছ ধরতে দেখা গেছে। উন্মুক্ত মাছ ধরার ট্রলারগুলো পুরো মেঘনা নদীতে ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে। জেলেরা নদীর তীরেই জাল ফেলানোর প্রস্তুতি নেয়। এরপর চেলে যান মাঝ নদীতে। জাল ফেলে কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর আবার জাল তুলে মাছ নিয়ে তীরে এসেই বিক্রি করে দিচ্ছে। তয় দিনেও দূরদুরান্ত থেকে শত শত নারী এবং পুরুষ মাছ কেনার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলো মেঘনা তীরে।

সরেজমিনে মেঘনা নদীতে শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করে দেখা গেছে, চরকেওয়ার ইউনিয়নের চরঝাপটা, জাজিরা, বকচর, চরআব্দুুল্লাহ এলাকার মেঘনা নদীতে শত শত জেলেদের অবস্থান। দ্রুতগামী ট্রলার দিয়ে জেলেরা নদীতে জাল ফেলছে আবার জাল টেনে তুলছে। মেঘনা তীর জুড়ে জেলেরা ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায়। এক একটি জেলে নৌকায় ৮/১০জন জেলে । তারা ট্রলারে থাকা কারেন্টজালগুলো গুছিয়ে প্রস্তুত করেই নদীতে ছুটে যাচ্ছে।

২০/৩০ মিনিটের মধ্যেই নদীতে জাল ফেলে মাছ নিয়ে একই ট্রলার আবার তীরে আসে মাছ বিক্রি করতে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের এই কর্মযজ্ঞ দেখা গেছে। নদীর তীরে দুর দূরান্ত থেকে ক্রেতারা এসে দাঁড়িয়ে থাকে। একটি জেলে নৌকা তীরে ভিড়লেই হুমরি খেয়ে পড়ে তারা। কার আগে কে কিনবে। বড় ইলিশ ১ হাজার টাকা হালি বিক্রি হয়েছে বকচর এলাকায়। ছোট আর মাঝারি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৫শ থেকে ৭শ টাকা হালি।

বিকেলে জেলে নৌকার অবরন কেন্দ্রে জুড়ে শত শত নারী ও পুরুষ ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ারমত । মাছ ক্রেতাদের নদীর তীরে অবস্থান দেখে মনে হয়েছে তারা সরকারী সাহায্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। বাজারের ব্যাগ, চালের বস্তা নিয়ে তীরে মাছ কেনার অপেক্ষা তাদের কাছে যেন ঈদের দিন। মাইলের পর মাইল হেটে মেঘনা নদীতে যাওয়া তাদের কাছে কোন সমস্যাই না।

ক্রেতারা বলছে কমদামে পাচ্ছে তাই কিনছে। ধরা বন্ধ থাকলেও তো তারা কিনতো না। তারা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানে এবং অণ্যকে বুঝাতে পারদর্শী । কিন্তু মাছ কিনতে গিয়ে হেনেস্তা আর জেল জরিমানাকেও তারা ভয় পাচ্ছে না। গ্রাম্য প্রবাদ বিচার মানি কিন্তু তাল গাছটা আমার। জেল হউক আর জরিমান হউক মাছ তাদের কিনতেই হবে। বেশীরভাগ ক্রেতাদের মনোভাব এমনটাই ছিলো।

মাছ কেনার পর তারা পায়ে হেটেই গন্তেব্যে রওয়ানা দিচ্ছে। দেখে মনে হবে তারা বাজার করে বাড়ী ফিরছে। তয় দিনে নদীর তীরে জালসহ মাছ ধরার নৌকাগুলোর অবস্থান দেখে মনে হয়েছে ইলিশ ধরার মুখ্য সৌসুমেই জেলেরা মাছ ধরছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তারা ইলিশ মাছ নিধন করলেও তাদেরকে ধাবিয়ে রাখার মত যেন কেউ নেই।

ইলিশ ক্রেতা মোজাম্মেল হক বলেন, ১ হাজার টাকা হালি মাছ কিনছি। যারা মাছ কিনতে আসছে তারা সকলে। জানে মাছ ধরা, পরিবহন এবং ক্রয় বিক্রয় অপরাধ। আমি নারায়নগঞ্জ থেকে মাছ কিনতে আসছি। মাছ কেনা তো অপরাধ ? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আরে বাবা শত শত জেলে মাছ ধরে। আমরা কিনে না খেলে এই মাছগুলোতো ফালানো যাবে না। আমি না কিনলেও অন্য কেউ কিনবে।

আরেক নারী ছামিরন বেগম বলেন, আসছি মাছ কিনতে জাজিরা থেকে। সকালে এসে কিছু মাছ কিনছি এখন আসলাম আরো কিছু কিনবো। আপনারা এসছেন কেন ? আপনাদের দেখলে জেলেরা বিক্রি করতে রাজি হয় না। আপনারা ছবি তুলে চলে যান। আমাদের একটু সুযোগ দেন। মাছ কেনা তো অপরাধ? পাল্টা জবাবে ওই নারী বলেন, শোনেন নদীতে মাছ ধরতাছে এটা প্রশাসন জানে। প্রশাসন আসবে এটাও জেলেরা জেনে যায়। আমরা ট্রলার থেকে মাছ কিনবো এখানে প্রশাসন আসলেই বা কি ? । দরকার হলে গ্রাম থেকে কিনবো। প্রশাসন আসলে তো ঘন্টার পর ঘন্টা থাকবে না।

স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা অভিযোগ করে বলেন, জেলে নৌকাগুলো সকাল থেকেই মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করেছে। প্রশাসন মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে প্রশাসন উন্মুক্ত রাখছে। অভিযান চালিয়ে নদীতে এবং নদীর তীরের সব জেলে নৌকাগুলো আটক করা জরুরি। জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষার্থে প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। জেলেদের বাড়ীতে বাড়ীতে ইলিশ মজুদ হচ্ছে।

নদীর তীরে বসে অস্থায়ী মাছ বিক্রির হাট। দুর দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষের পদচারনায় মুখরিত মেঘনা তীর। তারা তো মেঘনা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছে না। আসছে জাতীয় সম্পদ ইলিশ ধবংস করতে। সকালে প্রশাসনের লোক আসছিলো। এরপর তারা চলে গেছে । জেলেরাও শুরু করেছে মাছ ধরা। ৩য় দিনে নদীতে জেলে নৌকার পরিমান ছিলোও দ্বিগুন। প্রশাসন আসবে এটা কিভাবে জেলেরা জেনে যায় । আপনারা সাংবাদিক আসছেন ওটা আপনারা মিনাবাজার পার হয়েছেন আর এখানে খবর চলে আসছে সাংবাদিক আসতাছে। কোন প্রশাসনের লোক আসবে এটাও জেলে এবং গ্রামবাসী সহজে জেনে যায়। ইলিশ মাছ রক্ষার্থে কঠোর অভিযানের কোন বিকল্প নেই।

মুন্সীগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুনীল মন্ডল বলেন চমক নিউজকে, সকালে বকচর এলাকায় অভিযান চালিয়েছি। লোকবল সংকটের মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছি। জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, নৌ পুলিশ এবং কোষ্টগার্ডের সদস্যরাও কাজ করছে। মেঘনায় একর পর এক অভিযান চালিয় অবৈধ জেলেদের আইনের আওতায় আনা হবে।

স/এষ্

Print Friendly, PDF & Email
Spread the love