মুন্সীগঞ্জে অপ্রতিরোধ্য জেলেরা নিধন করে যাচ্ছে মা ইলিশ

মুন্সীগঞ্জে অপ্রতিরোধ্য জেলেরা নিধন করে যাচ্ছে মা ইলিশ

এম এম রহমান, মুন্সীগঞ্জ: মেঘনা নদীতে নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিন থেকেই দিনে রাতে অবাধে মা ইলিশ নিধন যাচ্ছে স্থানীয় জেলেরা। মেঘনা তীরে শত শত ট্রলার নিয়ে জেলেদের কর্মব্যস্ততা দিন দিন বেড়েই চলছে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা আর সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্য গতিতে নদীতে জেলেদের অবস্থান। গ্রামগুলোতে জেলেরা বাড়ীর উঠানে নিষিদ্ধ কারেন্টজালগুলো প্রস্তুত করছে ।

www.linkhaat.com

তাদের কর্মযজ্ঞ দেখলে মনে হবে অভিযানের সয়ম পার হয়ে গেছে। সরকারী নিষেধাজ্ঞাকে কোনভাবেই তোয়াক্কা করছে না জেলেরা। গ্রামগুলোতে পিছিয়ে নেই নারীরাও ।

স্বামী জেলে আর স্ত্রী হন সোর্স হিসেবে কাজ করে। হাতে মোবাইল নিয়ে নদীর তীর এবং গ্রামের আনাচে কানাচে দাঁড়িয়ে থাকে নারীরা। নদী বা স্থল পথে প্রশাসনের উপস্থিতে টের পেলে ফোনের মাধ্যমে নারীরা মুহুর্তের মধ্যে নদীতে থাকা অন্যান্য জেলেদের নিকট সংবাদ পৌছে দিচ্ছে।

জেলারা নদীর তীরে অবস্থান করে মাছ শিকার এবং তীরে এসে বিক্রি করে দিচ্ছে। এক ধরনের মৌসুমী মাছ বিক্রেতারা নদীর তীরে এবং বসতবাড়ীতে রেখে ইলিশ বিক্রি করছে। মেঘনা নদী তীরবর্তী গ্রাম চরঝাপটা, বকচর, চরআব্দুল্লাহ, কালিরচর এলাকায় প্রকাশ্যে মা ইলিশ নিধন, পরিবহন, বিক্রয় এবং মজুদ চলমান থাকলেও যেন এসব দেখার কেউ নেই। স্থানীয়রা জানান , নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিন থেকেই জেলেরা নদীতে মাছ নিধন করেই চলছে। সারাক্ষন মাছ ধরার ট্রলারগুলো নদী এবং নদীর তীরে অবস্থান ।

মাঝে মধ্যে নদীতে দু”একটা সিবোট টহল দিলেও সেটা জেলেদের নদী থেকে বিতারিত করার জন্য যথেষ্ট না। প্রশাসনের লোক চলে যাওয়ার সাথে সাথেই জেলেরা জাল ফেলে নদীতে। শত শত মাছ ধরার ট্রলার মেঘনা নদীতে উন্মুক্ত আছে। জেলেরা নদীর তীরেই জাল ফেলানোর প্রস্তুতি , প্রকাশ্যে ইলিশ ধরা। ধরে এনে তীরে বিক্রি এবং ক্রেতাদের ব্যাপক উপস্থিত আদৌ কি প্রশাসনের নজরে আসবে।

সরেজমিনে মেঘনা নদীতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করে দেখা গেছে, চরকেওয়ার ইউনিয়নের চরঝাপটা, জাজিরা, বকচর, চরআব্দুুল্লাহ এবং কালিচর এলাকার মেঘনা নদীতে হাজার হাজার জেলেদের অবস্থান। দ্রুতগামী ট্রলার দিয়ে জেলেরা নদীতে জাল ফেলছে আবার জাল টেনে তুলছে। আবার বেশীরভাগ জেলে নদীর তীরে অবস্থান করে আবারও জাল গুছাতে তীরে আসে।

মেঘনা তীর জুড়ে জেলেরা ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায়। এক একটি জেলে নৌকায় ৮/১০জন জেলে । তারা ট্রলারে থাকা কারেন্টজালগুলো গুছিয়ে প্রস্তুত করছে নদীতে ফেলার জন্য। জাল ফেলানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই তারা চলে যাচ্ছে মাঝ নদীতে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই জাল নদীতে ছেড়ে জালের শেষ মাথায় গিয়ে আবার টান দিচ্ছে।

একটা জেলে নৌকা নদীতে ১০ মিনিটের কর্মব্যস্ততায় লুফে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকার মাছ। একটি জেলে নৌকা প্রতিবার জাল ফেলে ৫০ হাজার টাকারও বেশী মাছ আহরন করতে পারে। আর সেই মাছ কেনার জন্য নদীর তীরে শত শত নারী পুরুষ অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। মাছ ধরার ট্রলার তীরে ভিড়ানোর সাথে সাথেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। বড় ইলিশ ১ হাজার থেকে ১২শ টাকা হালি।

ছোট আর মাঝারি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৫শ টাকা থেকে ৮শ টাকা হালি। বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী পুরুষরা এসব ডিমওয়ালা মাছগুলো কিনে নিচ্ছে। জেলে নৌকার অবরন কেন্দ্রে জুড়ে শত শত নারী ও পুরুষ ক্রেতাদের উপস্থিতি। কার আগে কে কিনবে এ নিয়েও চলে প্রতিযোগিতা।

স্থানীয় মৌসুমী ব্যবসায়রা তীরে মাছের ডালা নিয়েই এসে চিল্লাইয়া বলে হালি ১২শ । এটা শুনেই হুমরি খেয়ে পড়ে ক্রেতারা। মুহুর্তের মধ্যেই কারাকারি করে মাছ কিনে নিয়ে যায় ক্রেতারা। অনেক সময় মাছ ক্রেতাদের নদীর তীরে অবস্থান দেখলে মনে হয় দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে এরা সরকারী সাহায্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। বাজারের ব্যাগ, চালের বস্তা নিয়ে তীরে মাছ কেনার অপেক্ষা ।

মাইলের পর মাইল হেটে মেঘনা নদীতে যাওয়া এটা তাদের কাছে যেন ঈদের আনন্দের চেয়ে বেশী। ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতার অভাব লক্ষ করা গেছে। তারা জানে ধরা ক্রয়,বিক্রয় এবং পরিবহন দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু তারা বরাবর জেলে আর প্রশাসনকেই দায়ী করেন। নদীর তীরে জালসহ মাছ ধরার নৌকাগুলোর অবস্থান দেখলে মনে হবে ইলিশ ধরার মুখ্য সৌসুমেই জেলেরা মাছ ধরছে।

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তারা ইলিশ মাছ নিধন করেই চলছে। নদী তীরবর্তী গ্রামের বাড়ীগুলোতে রাতের বেলা যেসকল জেলে নদীতে যাবে তারাও এক ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দ্বিতীয় দিনেও নদীর তীরেও উৎসুক জনতা এবং ইলিশ ক্রেতাদের ছিলো উপচে পড়া ভিড়। এসময় কথা হয় বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা একাধিক নারী ও পুরুষদের সাথে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইলিশ ক্রেতা জানান, গত বছর বকচর থেকেই তারা মাছ কিনেছে। এবছরও নিজের এবং আত্নীয়দের জন্য মাছ কিনতে তারা নদীর তীরে এসেছে। ৮শ টাকা থেকে শুরু করে অনেকে ব্যাগ ভর্তি ইলিশ কিনেছে।

মাছ কেনা অপরাধ এটা জানার পর কিনলেন কেন ? সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মাছ কেনা যাবে না। আপনাদের উচিত সরকারকে সহায়তা করা। এমন শত প্রশ্নের জবাবের উত্তর একটাই মেলে জানি অভিযান। নদীতে জেলেরা ধরে তাদেরকে থামানো হউক। কম দামে কিনতে পারি তাই কিনি। সারা বছর তো কম দামে কিনে খাওয়ার সামর্থ নাই। নদীতে বন্ধ করুক আমরাও কিনবো না।

আরেক নারী জানান, অভিযান দিছে সরকার কিন্তু জেলেরা তো জালসহ নদীতে আছেই। প্রশাসনের লোক এসে জাল এবং নৌকাগুলো আটক করেনা কেন ? অভিযান দিলে আবার মাছ ধরে কেমনে। ধরে দেখেই তো কম দামে কিনতে আসছি। যারা ধরতাছে তাগো গিয়া জিগান ।

বেশীরভাগ ক্রেতার জবাব এরকমেরই। তবে স্থানীয় জেলেরা বলছে সরাবছর নদীতে মাছ পাইনা। দাদন, লগ্নি নিয়া জাল করছি। মাছ ধরার নৌকা বানাইছি। অনেক খরচ হয়েছে ১০/১২ দিন পর নদীতে আর মাছ থাকবেনা। আপনারা সরকারী আইন অমান্য করছেন জেল জরিমানা হবে ? এমন প্রশ্নের সহজ জবাব, জেলে গেলে যামু। সবার যে গতি আমাদের তাই হবে। সব জেলে ট্রলার আটকে রাখুক চেয়ারম্যান মেম্বারা। নদীতে অন্যান্য জেলেরা নামে তাই আমরা নেমে পড়ি মাছ ধরতে।

স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা অভিযোগ করে বলেন, জেলে নৌকাগুলো এই ২২ টা দিন আটক রাখলে তো এখন তারা বের হতে পারতো না। প্রশাসন জেলে নৌকা এখন মেঘনায় উন্মুক্ত থাকার সুযোগ দিছে। নৌকাগুলোকে তালাবন্ধ এবং মেঘনা তীরবর্তী গ্রামে যার যার বাড়ীতে জাল আছে এগুলোও জব্দ করতে হবে।

ইলিশের প্রধান প্রজনন সারাদেশে ইলিশ মাছ আহরন, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত করন এবং ক্রয়- বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। কিন্তু মেঘনা নদীর জেলেরা দ্বিতীয় দিনেও বেপরোয়া । দিনভর নদীতে জেলেরা মাছ ধরেই চলছে।

মুন্সীগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুনীল মন্ডল চমক নিউজকে বলেন, লোকবল সংকটের মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। মৎস্য অফিসের জনবল সংকট রয়েছে। তার পরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

স/এষ্

Print Friendly, PDF & Email
Spread the love