মুন্সীগঞ্জে ঝিনুকে মুক্তা চাষে ব্যাপক সফলতা

এম এম রহমান: মুন্সীগঞ্জ শহরের বৈখর এলাকায় ঝিনুকে ইমেজ মুক্তা চাষ করে সফল এবং লাভবান হয়েছে আতিকুর রহমান। সখের কারনে গাজীপুরের টঙ্গি রেল স্টেশন এলাকার সেলিমের কাছ থেকে মুক্তা চাষের ট্রেনিং আতিকুর ।

এরপর নিজ বাড়ীতে ১ শতাংশ জায়গাতে পরিক্ষামূলকভাবে শুরু করেন মুক্তা চাষ। সাধারনত ঝিনুক পুকুরে ছাড়ার ৭-৮ মাস পরই ওই নকশার উপর ঝিনুকের আঠালো রস পড়ে হুবহু ওই আকৃতির ইমেজ মুক্তা উৎপাদিত হয়। বর্তমানে আতিকুর নিয়মিত মুক্তা সংগ্রহ করে খচরা এবং পাইকারী বিক্রি করে পাচ্ছে নগদ অর্থ। অল্প জায়গায় বেশ ভালো পরিমান মুক্তা উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে।

www.linkhaat.com

তার মুখে এখন আনন্দের হাসি। আর্থিক সহায়তা পেলে তিনি বড় পরিসরে ঝিনুক চাষ করার জন্য আগ্রহী হয়েছেন। জানাগেছে, এ বছরের এপ্রিল মাসে ৭শ ঝিনুক মুক্তা চাষের জন্য পানিতে ছাড়া হয়। বর্তমানে তা বেড়েছে ৫০ শতাংশ । নিম্ন মানের ঝিনুকে চাষ এবং মুক্তা ভালো হলেও সেটা বেশী সুবিধের নয়।

যদি চাষিরা সিলেটের হবিগঞ্জের ঝিনুক সংগ্রহ করে চাষ করতে পারলে লাভের পরিমান আরো বৃদ্ধি পাবে বহুগুন। আতিকুর রহমান তার নিজ বাড়ীতে ইমেজ মুক্তা চাষ করেছেন। এই মুক্তা দিয়ে কানের দুল, নাকফুল,আংটি এবং টিকলি তৈরী হয়ে। বর্তমানে ইমেজ মুক্তার চাহিদা বেশী থাকায় দামও বেশী।

এ বি, সি এই তিন ক্যাটাগরিতে দাম নির্ধারন করা হয়। ইমেজ মুক্তার দাম সর্ব নিম্ন ২শত টাকা এবং সর্বোচ্চ ৮ শ টাকায় খুচরা বিক্রি করা হয়। ঝিনুকের খাবার হিবেসে গোবর, টিএসপি, কেচোসার, ইষ্ট, সরিষার খইল এগুলো একত্রে মিশিয়ে একটি খাবার তৈরী করা হয়। এটা যখন পঁচে দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয় তখনই এগুলো ঝিনুকের খাবার উপযোগী খাদ্য হয়। ঝিনুক চাষে শীতের সময় পানির গভীরতা সর্বোচ্চ সাড়ে চার ফিট এবং সর্ব নিম্ন দুই ফিট। গরমের সময় সর্বোচ্চ পাঁচ ফিট এবং সর্ব নিম্ন তিন ফিট পানির গভীরতা থাকতে হয়।

ইমেজ মুক্তা থেকে এক বার করে মুক্তা সংগ্রহ করা যায়। এক বছর বয়সী ঝিনুকের পেটের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন প্রধার ইমেজ। যেমন পয়সার মতো খোদাই করা লোগো। খোদাইকৃত আংটির খাজ, টিনলিসহ অন্যান্য ডিজাইনের ইমেজ। ঝিনুকের পেটে ইমেজ ঢুকানোর পর ঝিনুকের পেটে ব্যাথা অনুভব হয়। তখন ঝিনুক এক ধরনের ক্যামিকেল পেটের ভিতরে ছাড়ে যেন ব্যাথা কমে।

এভাবে ব্যাথা কমানোর জন্য ঝিনুক প্রতিনিয়ত এক ধরনের তরল পদার্থ তার পেটে ছাড়ে। এই তরল পদার্থ জমাট হয়েই মুক্তা তৈরী হয়। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য অপার সম্ভাবনাময় একটি খাত হয়ে উঠতে পারে ঝিনুক শিল্প। ঝিনুক নিয়ে কারবারে স্বল্প মেয়াদে বেশি মুনাফা অর্জন সম্ভব না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর উচ্চতা অন্য অনেক কিছুকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ঝিনুককে কাজে লাগানোও সম্ভব বিভিন্নভাবে।

ঝিনুক থেকে পাওয়া যায় মুক্তা। এছাড়াও চুন, নানা ধরনের অলঙ্কার, শোপিস ইত্যাদির মাধ্যমেও ঝিনুক দিয়ে ব্যবসা লাভজনক খাতে পরিণত করা সম্ভব। এছাড়া ঝিনুকের মাংস মৎস্য ও পোল্ট্রি ফার্মেও ব্যবহৃত হয়। ঝিনুক লোনা ও স্বাদু উভয় পানিতে হয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বহুকাল থেকেই মূল্যবান মুক্তা আহরণের জন্য ঝিনুক চাষ করে আসছে। মুক্তা উৎপাদনে চীন, জাপান শীর্ষস্থান দখল করে আছে বহুদিন ধরে।

এছাড়া ভারত, ফিলিপাইন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, স্পেন, ইতালি ইত্যাদি দেশেও ব্যাপক হারে ঝিনুক চাষ হয়ে থাকে। ইউরোপ-আমেরিকায় খাবার হিসেবেও ঝিনুকের জনপ্রিয়তা কম নয়। ঝিনুক থেকে প্রাপ্ত মুক্তা কেবল সৌখিনতা ও আভিজাত্যেরই প্রতীক নয়, এই মুক্তা বেশ কিছু জটিল রোগের চিকিৎসাতেও ব্যবহৃত হয়।

স্থানীয়রা জানান, ঝিনুক শিল্প নিয়ে বিপুল আর্থিক সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশে এখনো তেমন একটা ব্যাপকতা লাভ করতে পারেনি এ শিল্প। তবে সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জে প্রথমবারের মত ইমেজ (প্রতিচ্ছবি) মুক্তা চাষে সফলতা পেয়েছে। মিঠাপানির ঝিনুক থেকে পাখি, মাছ, নৌকাসহ বিভিন্ন বস্তুর নকশার দৃষ্টিনন্দন ইমেজ মুক্তা উৎপাদনে তাদের এই সফলতা। আতিকুর রহমানকে দেখে এলাকার যুবকরাও মুক্তা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

তিনি নিজ বাড়ীতে মাত্র এক শতাংশ জমিতে এই সফলতা পেয়েছে। এলাকার বেকার যুবকরা প্রশিক্ষন নিয়ে মুক্তা চাষের পাশাপাশি মাছ চাষ করেও স্বাবলম্বী হতে পারবে।

মুক্তা চাষি আতিকুর রহমান জানান, ঝিনুক চাষ করে মুক্তা উৎপাদন করে সফল হয়েছি। আমি পরিক্ষামূলকভাবে চাষ করেছিলাম। আগামী ডিসেম্বরে আরো বড় পরিসরে ঝিনুক চাষ করিব। বেকার যুবকরা খুব কম খরচে ঝিনুক চাষের মাধ্যমে মুক্তা উৎপাদন করতে পারবে।

তারা যদি ঝিনুকের পাশাপাশি একই পুকুরে মাছ চাষ করে তাহলে আরো ভালো। এতে করে ছিনুকের জন্য আলাদা খাবার লাগবে না। মাছের খাবারে উৎকৃষ্ট অংশ পানির নিচে গিয়ে পঁচে এক ধরনের খাবার তৈরী হয়। সেই খাবার খেয়েই ঝিনুক বেড়ে উঠে। পাশাপাশি প্রয়োজনবোধে আলাদা খাবারও দেয়া যায় ।

মুক্তা বিজ্ঞানী ড. মোহসেনা বেগম তনু চমক নিউজকে জানান, বাংলাদেশে মিঠাপানির ঝিনুকের মধ্যে দুই প্রজাতির ঝিনুক ইমেজ মুক্তা উৎপাদনে অধিকতর উপযোগী। ইমেজ মুক্তা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় আকৃতির স্বাস্থ্যবান ঝিনুক বাছাই করা হয়।

পরে চ্যাপ্টা আকৃতির বস্তুর (মোম, প্লাষ্টিক, স্টিল) অবয়ব ঝিনুকে স্থাপন করে ঝিনুক পুকুরে ছেড়ে দেয়া হয়। ঝিনুক পুকুরে ছাড়ার ৭-৮ মাস পরই ওই নকশার উপর ঝিনুকের আঠালো রস পড়ে হুবহু ওই আকৃতির ইমেজ মুক্তা উৎপাদিত হয়।

স/এষ্

Print Friendly, PDF & Email
Spread the love