হারিয়ে যাচ্ছে মক্তব, পবিত্র কোরআন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা

এম এম রহমান, মুন্সীগঞ্জ: কালের বিবর্তনে মুন্সীগঞ্জ জেলায় হারিয়ে যাচ্ছে পবিত্র কোরআন শিক্ষার মক্তব। অনিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন কি›ন্ডারগার্টেনগুলোর কারনে শিশুরা কোরআন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আগের মত এখন আর কঁচিকাঁচা শিশুদের কোরআন শিক্ষার জন্য মক্তবে যেতে দেখা যায় না।

কালিম আর আলিফ, বা, তা শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেনা জনপদ। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ছিলো কোরআন শুদ্ধ করে জানে এমন একটি মেয়ে হবে ঘরনী। যাতে বাড়ী ঘর কোরআনের শব্দে বরকতময় হয়ে উঠে।

www.linkhaat.com

শিশুদের কোরআন শিক্ষা এবং ইসলাম সম্পর্কে প্রাথমিক মৌলিক জ্ঞান অর্জনের উত্তম শিক্ষা কেন্দ্র হলো কোরআনি মক্তব। এখান থেকেই শিশুরা কোরআন তেলাওয়াত শেখার পাশাপাশি নামাজ, মাসলা মাসায়েল এবং কালিমা শিখতে পারে। অভিভাবকদের অবহেলার কারনে মসজিদের ইমাম সাহেবেরা এখন মক্তবে কোরআন পড়ানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

যার কারনে শিশু কিশোররা কোরআন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অধীনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন।

জেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনে অফিসের দেয়া তথ্য মতে, মুন্সীগঞ্জ জেলায় মোট ৩,৩২২টি মসজিদ রয়েছে । এরমধ্যে মুন্সীগঞ্জ সদরে ৭২৭টি, টঙ্গিবাড়ীতে ৪৪৬টি, লৌহজংয়ে ৩৭৯টি, সিরাজদিখানে ৬৬৩টি, শ্রীনগরে ৫৯৫টি এবং গজারিয়ায় ৫১২টি। বর্তমানে ২,৫০৮টি মসজিদে নামে মাত্র মক্তব আছে। কিন্তু সেখানে কোন ছাত্র/ ছাত্রী নেই। জেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক ৮১৪টি মসজিদে চালু আছে মক্তব ।

এরমধ্যে মুন্সীগঞ্জ সদরে ২৪২টি, টঙ্গিবাড়ীতে ১১১, লৌহজংয়ে ৯১, সিরাজদিখানে ১৪৯, শ্রীনগরে ১০৩ এবং গজারিয়ায় ১১৪টি মসজিদে মক্তব চালু আছে। মক্তব শিক্ষা কার্যক্রম চালু এবং বন্ধ থাকা উভয় মক্তবের শিক্ষকদেরকে প্রধানমন্ত্রীর মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্প হতে প্রতি ইমামকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে সম্নানী দেয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, জেলার প্রতিটা মসজিদেই প্রাক প্রাথমিক, নূরানী, বয়স্ক পুরুষ এবং বয়স্ক নারী এই চারটি বিভাগে মক্তবগুলোতে চালু আছে। প্রত্যান্ত অঞ্চলের গ্রামগুলোতেও মক্তব আছে। কিন্তু অধিকাংশ মক্তবে কোন শিশুরা যাচ্ছে না। মসজিদের ইমাম সাহেবরা মসজিদের মাইকে বাচ্চাদের ডেকে নিয়ে যায় মক্তবে। আবার কোন কোন এলাকায় ইমাম সাহেবরা হাজারো বার ডাকলেও অভিভাবকদের অবহেলায় শিশুরা কোরআন শিক্ষা নিতে যাচ্ছে না মক্তবে ।

একাধিক ইমাম ও মোয়াজ্জেমের সাথে মক্তব বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেনের অযুহাত দেখিয়ে অভিভাবকরা শিশুদেরকে মক্তবে পাঠাতে চায় না। ভোর সকালে নয় শিশুরা তাদের মত সময় করে আমাদের সহায়তায় কোরআন শিখতে পারে।

বয়স্ক নারী পুরুষরাও তাদের সুবিধামত সময়ে শিখতে পারে। ৩/৪ বছরের শিশুরা আসলেও ৪/৫ বছরের শিশুরা এখন কিন্ডারগার্টেন মুখী। অভিভাবকরা আধুনিক শিক্ষার নামে শিশুদেরকে সকালে ঘুম ভাঙ্গিয়ে টেনে হিচড়ে কিন্ডারগার্টেনে নিয়ে যায়। বাচ্চাদের মধ্যে ইসলাম শিক্ষার আলো না থাকলে এই সন্তানের জন্য পিতামাতাকে পরকালে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে । এই কথাটি যদি অভিভাকরা বুঝতো বা মেনে চলতো তাহলে ইসলামের আলোকে বাচ্চাদের কোরআন শিক্ষা দিতো।

অভিভাবক এবং স্থানীয় ধার্মিক পরিবারগুলো অভিযোগ করে বলেন, কিন্ডারগার্টেনগুলোতে আধুনিক শিক্ষার নামে শিশুদেরকে কোরআন শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ছোটবেলায় আমরা সকাল বেলা মক্তবে কোরআন শিক্ষা নিয়ে তারপর স্কুলে যাইতাম।

এখনকার সময়ে কিন্ডারগার্টেনগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম ভোর ৭ টা থেকে শুরু করে। আধুনিক শিক্ষার নামের ওইসব কিন্ডারগার্টেনগুলোতে বাচ্চারা চোখে ঘুম নিয়েই চলে যায়। অনেকক্ষেত্রে অভিভাবকদের কারনেই কোরআন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা। এখনকার ছেলে মেয়েরা আদব , কায়দা এবং আখলাক শিখতে পারছেনা। ফলে বড় হয়ে তারা আর মুরব্বিদের সালাম দিতে চায় না।

প্রতিটা শিশুকে কোরআন শিক্ষায় আলোকিত করলে পিতা মাতার ইহকাল এবং পরকালের জন্য মঙ্গল হবে। তারা আরো বলেন, যেকোন শিশুকে ছোটবেলা থেকে কোরআন, নামাজ শিক্ষা দিলে তারা নামাজী এবং ধার্মিক হয়। যা সমাজ এবং পরিবারের জন্য মঙ্গল । যেহেতু সরকার কোরআন শিক্ষার জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করছে । আমাদের সবার উচিৎ বাচ্চাদের আবারো মক্তবমুখী করা।

জেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ- পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কাশেম চমক নিউজকে বলেন, প্রাক প্রাথমিক, নূরানী, বয়স্ক পুরুষ এবং বয়স্ক নারী এই চারটি বিভাগে মক্তবগুলোতে পবিত্র কোরআন শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। করোনাকালীন সময় থেকে এখন পর্যন্ত মক্তবগুলো বন্ধ রয়েছে। আগামী জুনের পর থেকে ৫% থেকে ১০% মক্তবের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে সেলক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

স/এষ্

Print Friendly, PDF & Email
Spread the love