ইভিএম পরীক্ষায় পাস করবে নির্বাচন কমিশন

নিজস্ব প্রতিনিধি : বিরোধীদল ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের আপত্তি এবং ভোটারদের বিভ্রান্তি থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সকল ভোটকেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

www.linkhaat.com

এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে ইতিপূর্বে যে নির্বাচনগুলো সম্পন্ন হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা এবং নানাবিধ প্রশ্ন আছে। এবার নির্বাচন কমিশনের সামনে ইভিএম পরীক্ষা।

ভোটাররাও অভিযোগ করেছেন যে, ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলেও মেশিনগুলো সাধারণ ভোটারদের কাছে পরিচিত করার জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেনি নির্বাচন কমিশন।

বিরোধী দল বিএনপি এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ধারণা করছে, জনগণের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ইভিএম ব্যবহার করা হতে পারে। বিএনপির নেতারা বিভিন্ন সময় ইভিএমকে ‘ভোট ছিনতাইয়ের হাতিয়ার’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ইভিএম ব্যবহারের নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে ইভিএম ব্যবহার করে কিছু উপায়ে অনিয়ম হতে পারে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজউদ্দিন খান বলেছেন, “ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত সকল পক্ষের ঐক্যমতের ভিত্তিতে করা উচিত। কিন্তু তা হয়নি ।”

তিনি আরও বলেন, “ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমার অনিয়মের আশঙ্কা করছি। কারণ এতে ভোটার যাচাই করার জন্য পেপার অডিট ট্রেইল (ভোটার ভেরিফিকেবল পেপার অডিট ট্রেইল- ভিভিপিএটি) নেই। যদি ভোটারের আঙুলের ছাপ মেশিনের সঙ্গে না মেলে তাহলে নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওভাররাইড করার ক্ষমতা থাকবে।”

ইভিএমে পেপার ট্রেইল কেন রাখা হয়নি তা জানতে চাইলে এনআইডি উইংয়ের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, “আমরা দেখেছি যে পেপার ট্রেইল পদ্ধতিতে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা হয়। কখনও কখনও কাগজ প্রিন্ট হতে অনেক সময় নেয়। এ সমস্যার কারণে হঠাৎ করে ভোট নেওয়া বন্ধ করে দিতে হয়।”

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, কমিশন কর্তৃক গঠিত কারিগরি কমিটির প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর পরামর্শ অগ্রাহ্য করে পেপার ট্রেইল ইভিএমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

জানতে চাইলে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেছেন, “সভার কার্য বিবরণী কখনই প্রকাশ করা হয় নি এবং কমিটির চেয়ারম্যানের কাছে থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নির্বাচন কমিশন প্রথম ২০১২ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করেছে। ২০১৫ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বুয়েটের তৈরি ইভিএম ব্যবহার করতে গিয়ে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে বর্তমান ইভিএম ব্যবস্থা চালু করার জন্য চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়।

৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ সহ ছয়টি আসনে নতুন ইভিএম ব্যবহার করেছে নির্বাচন কমিশন।

সংসদ নির্বাচনের আগে কমিশনের নির্বাচনী সংলাপে বিএনপি ও জোটের দলগুলোসহ ৪০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৩৫টি দলই সাধারণ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিল।

ইভিএম সমর্থন করা পাঁচটি দল হলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, তাদের জোটের ওয়ার্কার্স পার্টি অব বাংলাদেশ, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, সাম্যবাদী দল (এম-এল) এবং জাকের পার্টি।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের আগে এবং পরে নতুন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে নতুন ইভিএম মেশিনগুলো আংশিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। গত বছর উপজেলা নির্বাচনে সকল জেলার সদর উপজেলায় ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছিল।

বিএনপি বরাবরই ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের অভিযোগ, এটি সরকারের ভোট কারচুপিতে সহায়তা করতে পারে। ২২ ডিসেম্বর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তফসিল ঘোষণার পর তাদের বিরোধিতা আরও জোরদার হয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “ইভিএম ভোট চুরির জন্য নীরব, স্বয়ংক্রিয় ও নির্দেশিত পদ্ধতি ছাড়া আর কিছুই না।”

তিনি আরও বলেন, “তারা ২০১৪ সালে ভোটার বিহীন এবং অন্যান্য দলের প্রার্থী বিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় গেছে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আগের রাতে ভোট চুরি করে ক্ষমতায় গেছে। এটা মানুষের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল।”

তিনি বলেছেন, “ইভিএম জনগণের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার নতুন কৌশল।”

ইভিএমে পেপার ট্রেইল না থাকায় তিনি নির্বাচন কমিশনের সমালোচনাও করেন।

শুধু বিএনপি নয়, বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী সাজেদুল হক রুবেল বলেছেন, সিটি নির্বাচনে ‘ইভিএম ব্যবহার করে ডিজিটাল কারচুপির ঘটনা ঘটবে’ বলে ভোটারদের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ৬ জানুয়ারি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, “নীরব ভোট কারচুপির কোনও সুযোগ নেই। আমরা জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার এবং সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করেছি। ভোটার বা প্রার্থীরা এ জাতীয় অভিযোগ তোলেননি।”

ইভিএম নিয়ে উদ্বেগ

ইভিএম দুটি ইউনিট ইউনিটের সমন্বয়ে তৈরি। একটি নিয়ন্ত্রণ ইউনিট এবং একটি ব্যালট ইউনিট। একটি তারের মাধ্যমে এটি সংযুক্ত থাকবে।

বিএনপি নেতারা ব্যালট ইউনিটের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। একজন ভোটারকে তার আঙুলের ছাপ যাচাই করতে হবে এবং তারপর ব্যালটি ইউনিটে ভোট দিতে যাবেন। এই ব্যালট ইউনিট আলাদা স্থানে রাখা হবে। বিএনপি বলেছে, কোনো ভোটার আঙুলের ছাপ দেওয়ার পরে যে কেউ তাকে ভয় দেখিয়ে বের করে দিতে পারে এবং তার হয়ে ভোট দিতে পারবে।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদাত হোসেন চৌধুরী (অব.) বলেছেন, এটি মেশিনের ব্যাপার না বরং আইন-শৃঙ্খলার বিষয়। তিনি বলেন, “বুথ যদি জোর করে দখল করা হয় তাহলে তা মেশিনের দোষ না।” তিনি আরও জানান, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ট্রাস্টি হাফিজউদ্দিন খান, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তোফায়েল আহমেদ উল্লেখ করেছেন, ভারত, ব্রাজিল, ফিলিপাইন, মেক্সিকোসহ ৮ থেকে ১০টি দেশ ইভিএম ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, “ব্রাজিল এবং ভারত বিরাট পরীক্ষামূলক, ত্রুটিপূর্ণ নীতি এবং মেশিনগুলো সংশোধন করার মধ্য দিয়ে গেছে।”

তিনি আরও বলেছেন, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস এবং আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলো নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছে।

বদিউল আলম মজুমদার প্রশ্ন রেখে বলেন, “বাজেটে বরাদ্দ না থাকার পরও কমিশন হঠাৎ কেন ইভিএম কেনার জন্য প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিলো, যেখানে বিএনপিসহ কমপক্ষে ১২টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এর ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিল?”

তোফায়েল আহমেদ এবং বদিউল আলম মজুমদার ইভিএম ভোটারদের আঙ্গুলের ছাপ সনাক্ত করতে না পারলে তা নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওভাররাইড করার ক্ষমতা দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

নির্বাচন কমিশনের জ্যৈষ্ঠ সচিব মো. আলমগীর বলেছেন, নির্বাচন কর্মকর্তারা মাত্র এক শতাংশ ভোটারের জন্য ইভিএমকে ওভাররাইড করতে পারবেন। তিনি বলেন, “অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।”

ইভিএমের প্রচার

শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেছেন, তারা সকল পোলিং সেন্টারে ইভিএম প্রদর্শনী করেছেন এবং ৩০ জানুয়ারি সকল ভোট কেন্দ্রে পরীক্ষামূলক ভোট গ্রহণ করবেন।

তিনি বলেন, “আমরা টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন প্রচার করছি, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিচ্ছি, বিদ্যালয়ে ইভিএম ব্যবহারের জন্য সচেতনতা তৈরির জন্য কর্মসূচি পালন করছি।”

নির্বাচন কমিশন মোট ৩৫ হাজার ইভিএম প্রস্তুত করেছে। প্রতি ১৪ হাজার ৬০০ ভোটের জন্য একটি করে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। প্রতিটি বুথের জন্য একটি করে ইভিএম আপদকালীন ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত হিসেবে রাখা হবে। ভোটের দিন দুই হাজার ৪৬৮টি ভোট কেন্দ্রের প্রতিটির জন্য দুই জন সেনা প্রযুক্তিবিদ মোতায়েন করা হবে।

স/এষ্

700
Print Friendly, PDF & Email