ময়মনসিংহে  টঙ্গীর নাট্যভূমি’র ‘মধ্যানুষ’ নাটকের প্রথম প্রর্দশনী

টঙ্গী প্রতিনিধি :  অনসাম্বল থিয়েটারের এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে ১৪-১৬ নভেম্বর তিনদিন ব্যাপি আয়োজিত নাট্যউৎসবে ময়মনসিংহ অনসাম্বল মুক্তমঞ্চে আগামী ১৬ নভেম্বর রোজ শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় নাট্যভূমি’র নতুন নাটক মধ্যানুষ প্রর্দশনী হবে।

নাটকটি রচনা করেছেন রোমেল রহমান, নির্দেশনা দিয়েছেন শাহজাহান শোভন। অভিনয়ে আছেন আ. স. ম জাকারিয়া, এসএম রায়হান রিপন, উজ্জল লস্কর ও তাছলিমা আক্তার দৃষ্টি।

নাটকের বিষয়বস্তু হল একরাতে বাগান মালির বস্তিঘরে চোরের মতো প্রবেশ করে মালিক। উদ্দেশ্য মালির স্বপ্ন কিনে নেবে সে। কারণ মালির এখন আর স্বপ্ন দেখেতে পারে না। কিন্তু ক্রয় ক্ষমতার প্রাচুর্যে স্বপ্নহীন হয়ে ওঠা মালিক স্বপ্ন কিনে নিতে চায়। মালি তার বেঁচে থাকার অবলম্বন স্বপ্নটাকে বিক্রি করতে রাজি না।

মালিক এবং মালির এই দর কষাকষির মধ্যে হাজির হয় মালির পাশের ঘরে ভাড়া থাকা এক মানুষ যে নিজের পরিচয় দেয় একজন মধ্যানুষ নামে! মালিককে মালির স্বপ্ন কিনিয়ে দেবার দায়িত্ব মধ্যানুষ নেয় এবং সে জানায় এই তার পেশা। মধ্যানুষেরা যার যা প্রয়োজন তাকে তাই কিনে দেবার কারবার করে নিজেদের বাঁচায়।

মালিক মধ্যানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বপ্ন কেনার ব্যাপারে এবং তাকে একটা ভালো অংক টাকা দেবার স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু মালি রাজি হয় না। মধ্যানুষ মালিকে বোঝাতে ব্যর্থ হয় ফলে মালি বউকে সে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, একটা স্বপ্ন বিক্রি করে দিলে তাদের আহামরি ক্ষতি হবে না।

বরং সেই স্বপ্নের বিনিময়মূল্যে তারা যেই পরিমাণ অর্থ পাবে তাতে তাদের বাকি জীবন সুখে শান্তিতে কেটে যাবে। কিন্তু মালি বউও যখন রাজি হয় না তখন মধ্যানুষ তাদেরকে ভয় দেখায়, ফলে মালি এবং মালি বউ দুজনে একরাতের অন্ধকারে তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন স্বপ্নটাকে বাঁচাতে শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়।

এই ঘটনার পর মালিক ক্ষেপে যায় এবং উন্মাদের মতো হয়ে ওঠে মধ্যানুষের উপর। তখন মধ্যানুষ মালিককে বস্তিতে থাকা আরেক দম্পতির গল্প শোনায়। পেশায় যারা বাবুর্চি এবং যারা স্বপ্ন দেখে যে, একদিন একটা এমন বিরাট হাড়িতে তারা রান্না করবে যেই হাড়ির খাবার আর ফুরাবে না এবং তার সুঘ্রাণে চারদিক পাগল হয়ে যাবে।

কিন্তু মালিক রাজি হয় না বরং সে বলে, মালির সেই স্বপ্নটাই আমার চাই যেই স্বপ্নটায় মালি দেখতো, তারা একদিন একটা বিরাট মাঠভর্তি ফুলের চাষ করবে এবং যেই মাঠের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই।

যেই মাঠের কিনার ঘেঁসে একটা নদী সেই নদীতে কে যেন গান গাইতে গাইতে নৌকা নিয়ে ফেরে অথচ তার খোঁজ করতে গেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

আর সেই মাঠ ভর্তি ফুলের সুবাসে মাতাল সারা ভুবন। মধ্যানুষ তার ব্যর্থতার কথা স্বীকার যায় এবং সে বাবুর্চির স্বপ্ন কিনে নেবার জন্য তদবির করতে থাকে মালিককে।

কিন্তু স্বপ্নলোভী মালিক মধ্যানুষকে বলে, সে বাবুর্চির স্বপ্ন নয় বরং সে এখন চায় মধ্যানুষের স্বপ্ন কিনে নিতে। ফলে মধ্যানুষ ভড়কে যায় এবং নিজের স্বপ্ন বিক্রি করতে রাজি হয় না। কিন্তু মধ্যানুষ টের পায় সে স্বপ্নগ্রাসী মালিকের জালে আটকা পড়ে গেছে। এভাবেই নাটকের কাহিনী চলেতে থাকে।

নাটক বিষয় নাট্যকার রোমেল রহমান বলেন, মধ্যানুষ নাটকটি নাট্যভূমি মঞ্চে আনছে শাহজাহান শোভনের নির্দেশনায়। নির্দেশক এবং অভিনেতা শাহজাহান শোভনের দীর্ঘ নাট্যযাত্রায় মধ্যানুষ সহযোগে আমার যুক্ত হওয়াটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা।

নাট্যভূমির সঙ্গে আমার নাট্যযজ্ঞ দীর্ঘ হবে এমনই অনুভব আমার। ভালোবাসা জানাই যারা মধ্যানুষ মঞ্চায়নে যুক্ত তাদের সকলের প্রতি এবং শিল্পী সুমন রহমানের প্রতি যিনি মধ্যানুষের পোস্টার এঁকে দিয়েছেন। আশারাখি মধ্যানুষ দর্শকের ভালোবাসা পাবে।

নাটকের নির্দেশক শাহজাহান শোভন বলেন, ‘দালালি বড় চটকদার ব্যবসা, পুঁজি লাগে না, লাগে না গদিঘর। ভক্ত কুত্তার মতো মনিবের পা চাটলেই হয়।’ মধ্যানুষ নাটক নির্দেশনার কাজ করতে গিয়ে আব্দুল হাই দূর্বার রচিত ও প্রেমনাথ রবিদাস নির্দেশিত ‘ছাগল সমাচার’ নাটকের এই সংলাপটি আজ খুবই মনে পড়ছে। বর্তমান সময়ে প্রায় সব কিছু বিক্রির জন্য দরকার একজন মধ্যানুষ (মধ্যসত্ত¡ভোগী)।

মালিক এখন আর স্বপ্ন দেখেন না। কিন্তুু তার টাকা আছে। আবার বাগানের মালির টাকা নেই কিন্তু সে প্রতিদিন স্বপ্ন দেখেন । মালিক জোর করে টাকা বিনিমনে মালির ছোট বেলা থেকে দেখা স্বপ্ন কিনে নেব । পন্যের মতো এই স্বপ্ন ক্রয় বিক্রয় করিয়ে দিবে মিডল্ম্যান অর্থাৎ মধ্যানুষ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- স্বপ্ন কি বিক্রি করা যায় ? স্বপ্ন বিক্রি করে কি মানুষ বাঁচতে পারে ? মরে যাবে তবুও মানুষ তার স্বপ্ন বিক্রি করতে চায় না। স্বপ্ন তো মানুষের বেঁচে থাকার প্রেরণা, শক্তি।

এ নাটকের মধ্য দিয়ে দর্শক এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন। মধ্যানুষ নাটক নাট্যভূমি’র ২৫তম প্রযোজনা। এ যাবৎকাল যাদের সহযোগিতায় নাট্যভূমি’র চলার পথ সুগম হয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

২০০৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর উদীয়মান নাট্যকর্মী ও সংগঠক শাহজাহান শোভন ১০ জন তরুন নাট্যকর্মী নিয়ে নাট্যদল নাট্যভূমি প্রতিষ্ঠা করেন। মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নাট্যভূমি’র চেতনার উৎস।

“সকল অশুভ আমাদের পদতলে” এ শ্লোগান ধারন করে নাট্যভূমি আগামী সুন্দর পথ চলার অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের যুবনাট্য ও গ্রুপ থিয়েটারের আদলে নাাট্যভূমি’র সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে নাট্যভূমি।

নাট্যভূমি প্রশিক্ষিত নাট্যকর্মী গড়ার লক্ষ্যে নিয়মিত নাট্যকর্মশালা ও মূকাভিনয় কর্মশালার আয়োজন করে থাকে । নাট্যউৎসব আয়োজন ও বিশ্বনাট্য দিবস পালন নিয়মিত কার্যক্রম। নাট্যভূমি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২৫টি নাটকের চারশতাধিক প্রর্দশনী করেছেন।

 

স/এন

Print Friendly, PDF & Email