একটি স্বাধীনতার গল্প

একটি স্বাধীনতার গল্প

—বোবা পথিক

আমরা তো স্বাধীনতার যুদ্ধ দেখেনি গল্প শুনেছি,ইতিহাস পড়েছি কিন্তু স্বদেশের সেই ভয়াল দিনগুলো কত টুকু ধারন করতে পারছি, আজ আমার এই গল্প করার সাহস নেই তবু দেশমাতার এই অবস্থা আর না করে পারলাম না।

আয়ুব আর দশজন যুবকের মত তাগড়া জোয়ান হয়েছে, গায় গতরে একদম যেন সাহসী বীর,
চারি দিকে যুদ্ধের দামামা বাজে, পাড়ার ছেলে শফিক আজ কতদিন যাবত তাকে দেশ মাতার এই বিপদে পাশে থাকতে বলেছে।

কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা আয়ুব এদিকে ঘরে নতুন বিয়া করা বউওবৃদ্ধা মা এদের একা রেখে কি করে যাবে তা সে ভেবে পাচ্ছেনা।
কিন্তু যেভাবে নরপশুর দল দেশকে শ্মশান করছে, অবাধে নিরীহ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তা আর বসে বসে দেখতে পারছেনা।

ওগো শুনছো শান্তাকে বললো আয়ুব, তোমাকে একটা কথা বলতাম যদি তুমি কিছু না মনে করো,
শান্তা আগ্রহ ভরে স্বামীর কথায় মন দিল,
আজ কত দিন যাবত দেখতেই পাচ্ছো দেশের কি অবস্থা, এমন সময় আমার মতো সচেতন মানুষ আরতো চোখ বুজে বসে থাকতে পারছিনা।

আজ দেশের প্রতিটা জায়গায় মানুষের হাহাকার, কোথাও যেন শান্তি নেই, এমন ভাবে চলতে থাকলে তুমি আমি একদিন কেউ নিরাপদ থাকবোনা,

এতক্ষণ শান্তা আয়ুবের কথা গুলো শুনছিলো একটা কথা ও বলেনি, কি বলবে তা যেনো ভেবে পাচ্ছেনা, তার গণ্ডদেশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।

জোরে একটা শ্বাস নিয়ে বললো আমার কি হবে? একটা জায়গা পেয়ে আয়ুব বললো একবার ভাবো তো শান্তা প্রতিদিন কত মায়ের বুক খালি হচ্ছে কতজন স্বামী হারাচ্ছে আর কত বোন তার আদরের ভাইয়ের ভালবাসা বঞ্চিত হচ্ছে।

শান্তার মুখে আর কোন কথা নেই, সে যেন বোকা হয়ে গেছে,নিথর পাথরের মত খাটের এক কোনে চুপ করে বসে রইলো।

দুজন অনেকক্ষণ কথা নেই, বাইরে থেকে নাম দরে কে যেন ডাক দিলো, কন্ঠো টা চেনা মনে হলো, হ্যাঁ এই তো শপিক ভাই, আর দেরি করা যাবেনা,সামনে প্রচুর বিপদ হারামির বাচ্চাগুলো আসার সময় আমাকে দেখে ফেলেছে,

যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে, শান্তা যেন বোবা হয়ে গেল,কিন্তু মা তার বুকের মানিক কে আটকানোর একটু ও চেষ্টা করলো না, যেন কোন চিন্তা নেই তার,মা আছমা বেগম যেনো শান্তি পাচ্ছে, মাকে সালাম করে আয়ুব বেরিয়ে পড়লো, প্রথমে তার একটু চিন্তা বাড়লেও পরে যখন ভাবলো দেশমাতার জন্য যদি আমার মতো অধমের জীবন যদি উৎসর্গ করতে পারি তাই বা আমার কম পাওয়া হবেনা।

আজ আট নম্বর সেক্টর কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধাদের একটা অপারেশন এর দায়িত্ব দিয়েছে, চার দলে ভাগ হয়ে আক্রমণ করতে হবে,পাকিস্তানি ঘাটিতে আয়ুব আর চারজন, রায়হান,মজিবর তোহা,নরেশ থাকবে দক্ষিণ প্রান্তে, আর শফিক এর দল যাবে পূর্ব দিকে, সিগনাল বলতে নিজেদের মুখের আওয়াজ, যতটুকু সংবাদ দিয়েছিলো মিলন এই পথ ধরে আজ মিলিটারি দল যাবে, সংবাদ টা একে বারে মিথ্যা নয়,মিলন মিলিটারিদের সাথে যোগাযোগ ভালই রেখে চলে, তার অবাধ এই আসা যাওয়া ফলে আমাদের লাভ হয়েছে, নিয়মিত সে পাকিস্তানি বাহিনীর সংবাদ আামাদের দিত।

হঠাৎ গাড়ির শব্দ শুনে সবাই যে যার মতো পজিশনে চলে গেলো, মুহুর্তে সামনে চলে আসাতে আক্রমণ টা খুব ভার হলো না, সাতজন মিলিটারির মধ্যে দুইজন কে মারতে পারলাম।

আজকের মত অপারেশন শেষ,
যে যার মতো আশ্রয় খুজে থাকা হলো, এমন সময় হাঁফাতে হাঁফাতে মিলন কোথা থেকে হাজির,

মিলন দেখে আয়ুব যেনো কিছু আন্দাজ করতে লাগলো,তবে কি কোন বিপদ,

কিরে মিলন,
তুই এখানে আর
আমি এখানে আছি তোকে কে বললো,
কথা যেনো বের হচ্ছেনা মিলনের,
কি বলবে ভেবে পাচ্ছেনা তবুও তো বলতে হবে না হলে পরে আরো সমস্যা হবে,
দেখ আয়ুব কাল যখন তুই মিলিটারির উপর আক্রমণ করছিলি,তখন জীপের ভিতর নেকবার চাচা বসে ছিলো, সে তোকে খুব ভাল ভাবে চিনতে পেরেছে,

মিলিটারী অফিসার যখন জানতে চাইলো আমার কাছে,
তোকে আমি চিনি কিনা,
আমি তো একবাক্যে বললাম না,
আমি তাকে চিনি না,
কিন্তু নেকবার চাচা সব পন্ড করে দিলো,
সেই তোর পরিচয সব বরে দিয়েছে,
তুই ভাই একটু সাবধানে থাকিস,

লোক টা খুব ভালা না, আর বাড়িতে গেলে সাবধানে যাস,
আমি আসি কেমন,

আয়ুব মিলনের কথা শুনে যতটা না নিজের জন্য চিন্তা হচ্ছে,
তারচেয়ে অধিক চিন্তা বেড়ে গেলো মা আর বউকে নিয়ে,

না জানি হারামির বাচ্চাগুলো ওদের কোন ক্ষতি না করে,
কয়েকদিন হয়ে গেল শান্তার কথা খুব মনে পড়ছে,

আজ তাকে না দেখলে মনে আর শান্তি পাওয়া যাবে না।
কমান্ডার কে বলে আজ একটু বাড়ি যেতে হবে,

রাত গভীর সবাই যখন ঘুমে মগ্ন তখন আয়ুব আলতো পায়ে এসে, বাড়ির দরজার কড়া নাড়তে লাগলো,
হঠাৎ করে এত রাতে দরজার কড়া নাড়তে দেখে শান্তা ও মা দুজনে ভয় পেয়ে গেছে,
পরিচয় দেবার পর শান্তা দ্রুত দরজা খুলে দিল, আমাকে কাছে পেয়ে যেন শান্তা তার উপর ভর করা রাজ্যের ক্লান্তি অবসাদ,মান অভিমান সব উগরে দিতে চাইলো,
কিন্তু কি করার আছে,

আমি তো শাড়ির আচলে বসে থাকলে চলবে না,

শান্তা কে বুকের উপর থেকে নামিয়ে, সোজা বের হয়ে যাব এমন সময় পা টা চলছে না,

শান্তা পা দুটো এমন ভাবে জড়িয়ে রেখেছে,

কি হলো পাগলী,
এভাবে পথ আটকালে কেনো,

আমাকে কথা দাও, তুমি ফিরে আসবে,
আমি তোমার ফেরা অপেক্ষায় থাকবো।
কি বলবে আয়ুব,আর কিভাবে এই মায়াবী চোখের, নিষ্টুর দাবি রাখবে তা বুঝতে পারছে না।

সে যে দেশমাতার তরে জীবন উৎসর্গ করেছে,
তবু ও বললো তুমি দোয়া রেখো,
যে শপথ নিয়ে দেশকে রক্ষার করার দায়িত্ব কাধে তুলে নিয়েছি,

তা পালন করে তোমার কাছে যেনো ফিরে আসতে পারি,

আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত আয়ুব বের হয়ে গেল, পথে নেকবার চাচার সাথে দেখা,

কি হেদায়েতের পুত, খুব নাকি মরদ হয়ছো,
তুমি নাকি দেশ স্বাধীন করবা,
তা বাপু বাবা নেই,
এই বুড়ো বয়সে মা কতো কষ্ট করে,

লেহাপড়া শেখাল,কই একটা চাকরি বাকরি খুজে তাকে একটু শান্তি দিবা তা না করে,কেন বাপু এই সব গন্ডগোল ফ্যাসাদের মধ্যে যেতে গেলে,

কি বলেন চাচা,আয়ুব এতক্ষন নেকবারের কথা গুলো শুনছিলো,
কোন জবাব করেনি,
এবার সে বলতে লাগলো,

আচ্ছা চাচা আমরা কি দোষ করেছি বলতে পারেন, কেন ঔই হারামির বাচ্চা গুলো আমাদের কে এভাবে নির্বিচারে মারছে,
আর কিভাবে আামাদের দেশের সম্পদ তারা নিয়ে যাচ্ছে।

এ্যা বেটা কয় কি?কয় ক্লাস পাস করে খুব চটরপটর কথা বলতে শিখেছো দেখছি,

কেনো চাচা শুনোনি আজ বেতারে কি কইছে,
,,এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,, এবারের সংগ্রাম আামাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।

পাশ থেকে মিরাজ বলে উঠলো, তাহলে আমাদের কি হবে চাচা,
নেকবার চাচা দাত ভেঙচিয়ে বললো আরে যা যা এমন বাণী কত শুনেছি,

ফক্কিনির পুতেরা নাকি করবে দেশ স্বাধীন,

এখনো সময় আছে, আমার সাথে হাত মিলাও আমি দেখি,
আমার পিয়ারে স্যার কে বলে তোম্কে বাচাতে পারি কিনা।

তার আর দরকার নেই,বলে বেরিয়ে পড়লো আয়ুব,
কিন্তু আজ মনটা খুব ভালো লাগছে না তার মনে হচ্ছে যেনো কলিজায় কে পেরেক ঠুকে দিচ্ছে,

সব কিছু গুছিয়ে নিয়েছে এমন সময় মিলন কোথা থেকে ছুটে আসলো আয়ুবয়ের কাছে,
কাঁদো কাঁদো গলায় বললো সব শেষ হয়ে গেছে,

এমন কথা মিলনের কাছ থেকে শুনে,আয়ুব যেনো কুচকে গেলো,
কি হয়েছে দ্রুত বল আমার সময় নেই, রনাঙ্গ থেকে আজ মুখোমুখি সমর যুদ্ধে যাব।

কথাটা বলতে মিলনের গলাটা ধরে এলো তবুও বলতে হবে,
নেকবার চাচা তোর বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছে, মিলিটারির দল তোর মাকে মেরে ফেলেছে,

আর
আর তোর বউ কে নির্যাতন করেছে।
কথা গুলো শুনতে যেনো আয়ুবের খুব কষ্ট হচ্ছিল তবুও নিজেকে সামলে নিল,

মিলন কে বললো মাকে দাফন দিস,

আর আমার বউটাকে সান্তনা দিস,সে যেনো ভেঙ্গে না পড়ে,
তার মতো কত নারী আজ এভবে নিজের সতীত্ব কে বিসর্জন দিয়েছে দেশ মাতার তরে।
আমি চললাম যদি দেশ মাতাকে মুক্ত করতে পারি তবেই ফিরবো, না হলে আর কোন দিন ফিরবো না,

দেশ স্বাধীন হলো আয়ুব ফিরে আসলো,
শান্তা তাকে দেখে নিজের মুখ লুকাতে চাইলো, আয়ুব শান্তাকে বোঝাল তোমার মতো কত নারী তার নিজের ইজ্জত বিসর্জন দিয়েছে, আর তুমি তো মহান কাজ করেছো,

এভাবে চলছিলো আয়ুবের জীবন,দেশ কে রক্ষা করার বিনিময়ে সে কোন প্রতিদান চাইনি, কি ক্ষতি তার জীবনে হয়েছে,তারও কোন হিসাব দেয়নি,

দেশ আজ উন্নতি হয়েছে, নেকবার চাচারা আজ মুক্তিযুদ্ধের সনদ নিয়েছে, টাকার জোরে এলাকার জনপ্রতিনিধি হয়েছে,

কিন্তু এই সব দেখে আয়ুব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছেনা,
সে প্রতিবাদ করে উঠে নেকবার চাচার বিরুদ্ধে, যার কারনে তার মা মারা গেছে,

যে তার প্রিয়তম স্ত্রীকে সতীত্ব হারাতে সাহায্য করেছে তাকে কিভাবে মেনে নেবে।

কিন্তু তার কথার কোন মৃল্য নে সে যে গরীবের ছেলে, কি করার আছে তার, শুধু উপরয়ালার কাছে নালিশ করা ছাড়া, কারন নেকবার চাচারা আজ এই সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যাক্তি,

তাইতো আজ খুব ঘৃর্না হয়, নিজের প্রতি, কেন তবে মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়েছিলাম।

স/এষ্

Print Friendly, PDF & Email